Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: সল্টলেকে ‘অরণ্য সপ্তাহ’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিবেশ রক্ষা, বনসৃজন এবং বন দপ্তরের আধুনিকীকরণকে সামনে রেখে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা করে তিনি শুধু বন সংরক্ষণের আহ্বানই জানাননি, একই সঙ্গে বন দপ্তরে নিয়োগ, গাছ পাচার রোধ, বনকর্মীদের কল্যাণ এবং হাতি-মানুষ সংঘাত মোকাবিলা নিয়েও সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
বৃক্ষরোপণ ও ছাত্রছাত্রীদের হাতে ফলের গাছ তুলে দিয়ে সূচনা
মুখ্যমন্ত্রী জানান, অরণ্য সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছে প্রচার ট্যাবলো উদ্বোধন, বৃক্ষরোপণ এবং ছাত্রছাত্রীদের হাতে ফলের গাছের চারা তুলে দেওয়ার মাধ্যমে। তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তুলতে শিশু-কিশোরদের এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বনমন্ত্রী মনোজ ওঁরাওয়ের নেতৃত্বে নতুন আশার বার্তা
অনুষ্ঠানে বনমন্ত্রী মনোজ ওঁরাওয়ের প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি বন দপ্তরকে আরও শক্তিশালী করে তুলবেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. সুব্রত মুখোপাধ্যায়, বন দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী দিবাকর ঘরামি, মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল, প্রধান সচিব মণীশ জৈন-সহ উপস্থিত আধিকারিকদেরও শুভেচ্ছা জানান।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পরিবেশ উদ্যোগের প্রশংসা
বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মায়ের নামে একটি গাছ’, স্বচ্ছ ভারত অভিযান, নমামি গঙ্গে, যোগা এবং খেলো ইন্ডিয়া-র মতো কর্মসূচি দেশের সামাজিক পরিবর্তনে বড় ভূমিকা নিয়েছে। তিনি জানান, কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের সঙ্গে আলোচনায় তিনি জানতে পারেন, শিবরাজ প্রতিদিন একটি করে গাছ লাগিয়ে দিনের কাজ শুরু করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই ধরনের অভ্যাসই পরিবেশ রক্ষার প্রকৃত বার্তা বহন করে।
“কংক্রিটের জঙ্গলে” হারিয়ে যাচ্ছে সবুজ (Suvendu Adhikari)
মুখ্যমন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পশ্চিমবঙ্গ দ্রুত কংক্রিটের জঙ্গলে পরিণত হচ্ছে। বিল্ডিং নির্মাণের সময় এক-তৃতীয়াংশ জায়গায় গাছ লাগানোর যে নিয়ম রয়েছে, বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হয় না। তিনি জানান, সরকারি সফরে বা নির্বাচনী প্রচারে হেলিকপ্টারে আকাশপথে ভ্রমণের সময় ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, তরাই-ডুয়ার্স, চালসা ও জলদাপাড়ার বনভূমির বর্তমান অবস্থা দেখে তিনি উদ্বিগ্ন হন। তাঁর মতে, একসময়ের ঘন সবুজ অরণ্যের বড় অংশ আজ অনেকটাই উজাড় হয়ে গিয়েছে।
৭ কোটি ২০ লক্ষ থেকে ১০ কোটি গাছ লাগানোর নতুন লক্ষ্য
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে রাজ্য সরকার চলতি বছরে ৭ কোটি ২০ লক্ষ গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি দাবি করেন, ৫ জুন একদিনেই ৯ লক্ষেরও বেশি গাছ লাগানো হয়েছে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় বেশি। এদিন তিনি আরও বড় লক্ষ্য সামনে রেখে বলেন, উত্তরপ্রদেশ যদি ২৬ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নিতে পারে, তাহলে পশ্চিমবঙ্গও চলতি বর্ষে ১০ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্যে এগোতে পারে।
জনপ্রতিনিধিদেরও নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেওয়ার আহ্বান (Suvendu Adhikari)
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শুধু সরকার নয়, জনপ্রতিনিধিদেরও এই সবুজ আন্দোলনের অংশ হতে হবে। তিনি প্রস্তাব দেন, একজন পঞ্চায়েত বা পুরসভার সদস্য অন্তত ১,০০০টি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নিন। প্রত্যেক বিধায়ক অন্তত ১ লক্ষ গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিন। প্রতিটি সাংসদ তাঁর লোকসভা এলাকার প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্র ধরে লক্ষাধিক গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করুন। তাঁর কথায়, এই সুস্থ প্রতিযোগিতাই রাজ্যকে আরও সবুজ করে তুলতে পারে।
দুই বছরের পরিচর্যার ওপর জোর (Suvendu Adhikari)
মুখ্যমন্ত্রী নিজের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, হলদিয়া ডেভেলপমেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান থাকাকালীন তিনি দেখেছেন, হাজার গাছ লাগালেও নিয়মিত পরিচর্যা না হলে কয়েক বছর পরে তার অর্ধেকও বেঁচে থাকে না। তাই তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, অন্তত দুই বছর প্রতিটি গাছের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে হবে।
রথযাত্রার শিবির থেকে ফলের গাছ বিতরণের নির্দেশ
রাজ্যের বিভিন্ন বড় রথযাত্রা উপলক্ষে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, স্বাস্থ্য দপ্তর ও পুলিশের যৌথ উদ্যোগে যে পরিষেবা শিবির বসানো হচ্ছে, সেখান থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ফলের গাছের চারা বিতরণের নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে ব্যাপকভাবে নারকেল গাছ বিতরণের আহ্বান জানান। তাঁর মতে, বেশি সংখ্যায় নারকেল গাছ থাকলে বজ্রপাতজনিত ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।
বন দপ্তরে বড় নিয়োগের ঘোষণা (Suvendu Adhikari)
অনুষ্ঠানের অন্যতম বড় ঘোষণা ছিল বন দপ্তরে দ্রুত শূন্যপদ পূরণ। মুখ্যমন্ত্রী জানান, বন দপ্তরের সমস্ত শূন্যপদের তালিকা দ্রুত প্রস্তুত করা হবে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে। পুলিশ রিক্রুটমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে বন দপ্তরে নিয়োগ করা হবে। কর্মরত অবস্থায় মৃত বনকর্মীদের পরিবারের দীর্ঘদিনের বকেয়া ফাইলও দ্রুত নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গাছ পাচার ও বেআইনি কাঠের মিলের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান বন দপ্তরকে কঠোর বার্তা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গাছ চুরি, গাছ পাচার এবং বেআইনি কাঠের মিলের বিরুদ্ধে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে যৌথ অভিযান চালাতে হবে। তিনি দাবি করেন, রাজ্যে যেমন গরু পাচার, সংগঠিত সিন্ডিকেট এবং বিভিন্ন বেআইনি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তেমনভাবেই বনসম্পদ রক্ষার ক্ষেত্রেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
হাতি সংরক্ষণ ও মানুষের নিরাপত্তা (Suvendu Adhikari)
জঙ্গলমহল-সহ বিভিন্ন এলাকায় হাতি-মানুষ সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, হাতি সংরক্ষণ যেমন জরুরি, তেমনই মানুষের প্রাণহানিও রোধ করতে হবে। এই দুই বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর তিনি জোর দেন।
আগের সরকারের সমালোচনা (Suvendu Adhikari)
বক্তৃতার শেষদিকে আগের সরকারের সমালোচনা করে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছরে বন দপ্তর পর্যাপ্ত বরাদ্দ, জনবল ও আধুনিক পরিকাঠামো পায়নি। তিনি বলেন, ওড়িশা ও ছত্তীসগঢ়ের বন ব্যবস্থাপনা থেকে শিক্ষা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আধুনিক ও শক্তিশালী বন প্রশাসন গড়ে তোলা হবে। তাঁর দাবি, ডবল ইঞ্জিন সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করবে।
আরও পড়ুন: Kolkata Metro Rail: চালকবিহীন মেট্রোর পথে বড় সাফল্য, গ্রিন লাইনে মিলল প্রাথমিক ছাড়পত্র
সবুজ পশ্চিমবঙ্গ গড়ার আহ্বান
বক্তৃতার শেষে রাজ্যের সমস্ত মানুষ, জনপ্রতিনিধি, শিল্প সংস্থা, সামাজিক সংগঠন এবং প্রশাসনের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী আহ্বান জানান, সবাই মিলে পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে সামিল হতে হবে। দূষণমুক্ত, সবুজ এবং বনসমৃদ্ধ পশ্চিমবঙ্গ গড়ে তুলতেই অরণ্য সপ্তাহকে জনআন্দোলনের রূপ দেওয়ার ডাক দেন তিনি।



