Last Updated on [modified_date_only] by Tania Rakshit
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: থেমে গেল একটা যুগ। শেষ হল আন্তর্জাতিক ফুটবলের এক বর্ণময় অধ্যায় (Cristiano Ronaldo)। পর্তুগালের লাল জার্সি গায়ে আর দেখা যাবে না ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোকে। বৃহস্পতিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগঘন বার্তায় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা করলেন পর্তুগিজ মহাতারকা। তুলে রাখলেন সাধের ৭ নম্বর জার্সি। যে জার্সি একসময় তাঁর পরিচয় হয়ে উঠেছিল, যে জার্সির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অগণিত গোল, অসংখ্য রেকর্ড, সাফল্য আর কোটি কোটি মানুষের আবেগ। ২৩ বছরের দীর্ঘ সফরের শেষে বিদায়বেলায় রোনাল্ডোর বার্তায় তাই শুধু অবসরের ঘোষণা নয়, ছিল এক যুগের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
১৮ বছরের তরুণ থেকে পর্তুগালের মহাতারকা (Cristiano Ronaldo)
২০০৩ সালের ২০ অগস্ট। কাজাখস্তানের বিরুদ্ধে পর্তুগালের জার্সিতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল ১৮ বছর ৬ মাস ১৫ দিনের এক তরুণের। তখন কে জানত, সেই ছেলেই একদিন হয়ে উঠবেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা মহাতারকা! শুরু হয়েছিল এক অবিশ্বাস্য যাত্রা। প্রতিটি ম্যাচে নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, প্রতিটি গোলের সঙ্গে নতুন ইতিহাস লেখা—এভাবেই কেটে গিয়েছে ২৩টি বছর।
এই দীর্ঘ সফরে শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ডের পাহাড় গড়েননি রোনাল্ডো, পর্তুগালকেও এনে দিয়েছেন ঐতিহাসিক সাফল্য। ২০১৬ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়, ২০১৯ এবং ২০২৫ সালে নেশনস লিগের খেতাব—জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর অর্জনের তালিকা দীর্ঘ। একটা সময় যে দলকে বড় ট্রফি জিততে দেখার স্বপ্ন দেখত পর্তুগাল, সেই স্বপ্ন পূরণের অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। আজ সেই অধ্যায়েই পড়ল শেষের দাগ।
‘৭ নম্বর জার্সিটা আমার একার নয়’ (Cristiano Ronaldo)
বিদায়বার্তায় রোনাল্ডোর কথায় বারবার ফিরে এসেছে দেশের প্রতি ভালোবাসা। পর্তুগালবাসীর উদ্দেশে তিনি লিখেছেন, “পর্তুগালবাসীর কাছে আমার ৭ নম্বর জার্সিটা ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। এই জার্সিটা আমাদের সবার। কখনওই মনে করিনি এটা শুধুই আমার। ২৩ বছর ধরে এই জার্সি গায়ে চাপানো, বিশ্বজুড়ে স্টেডিয়ামগুলোতে একে রক্ষা করা আমার কাছে পরম সৌভাগ্যের।”
সিদ্ধান্ত নেওয়া যে সহজ ছিল না, তা-ও স্পষ্ট করেছেন তিনি। রোনাল্ডোর কথায়, এই সিদ্ধান্ত শুধু মাথা দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়েও নেওয়া। কারণ ফুটবল তাঁর কাছে নিছক একটি খেলা নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক গভীর বন্ধন। তাই ৭ নম্বর জার্সি তুলে রাখলেও পর্তুগালের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যে কখনও শেষ হবে না, তা বলাই যায়।
রেকর্ডের ঊর্ধ্বে মানুষের ভালোবাসা (Cristiano Ronaldo)
রোনাল্ডোর কেরিয়ার মানেই রেকর্ড ভাঙা আর নতুন রেকর্ড গড়া। বিশ্বের সেরা ফুটবলার হওয়ার দৌড়ে বারবার নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি। পেয়েছেন সাফল্য, আবার হারের যন্ত্রণাও সহ্য করতে হয়েছে। বিদায়বার্তায় সেই কঠিন মুহূর্তগুলোর কথাও ভুলে যাননি পর্তুগিজ তারকা।
তাঁর কথায়, “এমন কিছু হার আছে, যা আজও যন্ত্রণা দেয়। ব্যর্থ হয়েছি, ভুগেছি। কিন্তু কখনও হাল ছাড়িনি।” এরপরই যেন ফুটবলজীবনের সবচেয়ে বড় উপলব্ধির কথা শুনিয়েছেন তিনি। গোল একদিন ম্লান হয়ে যায়, ট্রফি জায়গা পায় মিউজিয়ামে, রেকর্ডও একসময় ভেঙে যায়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যে জায়গা তৈরি হয়, সময় তা মুছে দিতে পারে না। হয়তো এই কথার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে রোনাল্ডোর ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের আসল সাফল্য।
জাতীয় সঙ্গীতের আবেগ (Cristiano Ronaldo)
এই দীর্ঘ পথচলায় যাঁরা পাশে থেকেছেন, তাঁদের কাউকেই ভুলে যাননি রোনাল্ডো। সতীর্থ, কোচ, সাপোর্ট স্টাফ থেকে শুরু করে পরিবার—সকলকে জানিয়েছেন আন্তরিক ধন্যবাদ। বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন পর্তুগালের জাতীয় সঙ্গীতের মুহূর্তের কথা। তাঁর কথায়, জাতীয় সঙ্গীতের সেই কয়েক মিনিটে সব ভেদাভেদ মুছে যায়। তখন সবার পরিচয় একটাই—পর্তুগাল।
এই আবেগই হয়তো তাঁকে বারবার মাঠে ফিরিয়ে এনেছে। ব্যক্তিগত সাফল্যের পাশাপাশি দেশের জন্য লড়াই করার তাগিদ জুগিয়েছে। হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা সমর্থকরাও যে একসঙ্গে জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছেন, সেই মুহূর্তগুলোই রোনাল্ডোর কাছে অমূল্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।
অমর হয়ে রইল ৭ নম্বর (Cristiano Ronaldo)
শেষবারের মতো পর্তুগালের জার্সিতে মাঠে নামার অধ্যায় শেষ (Cristiano Ronaldo)। কিন্তু রোনাল্ডোর গল্প কি সত্যিই শেষ হতে পারে? যে ফুটবলার নিজের পরিশ্রম, জেদ আর অদম্য মানসিকতা দিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন, তাঁর অবদান কোনও অবসর ঘোষণায় মুছে যাওয়ার নয়।
বিদায়বার্তায় রোনাল্ডোর শেষ কথাগুলোও তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। “মাঠের লড়াই শেষ। মাথা উঁচু রেখেই বিদায় নিচ্ছি। পর্তুগালের হয়ে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছি। ৭ নম্বর জার্সিটা পড়ে রইল, কিন্তু এটা পরার গর্ব আজীবন আমারই থাকবে। বিদায়।”
আরও পড়ুন: IPL 2027: নিলামের আগেই বড় চমক! চার তারকার ভাগ্য বদলে দিল কোন চাল?
হয়তো আর কোনও আন্তর্জাতিক ম্যাচে গোল করার পর সেই চেনা উদযাপন দেখা যাবে না। আর কোনও বড় টুর্নামেন্টে পর্তুগালের হয়ে তাঁর পায়ের জাদু দেখার অপেক্ষায় রাত জাগবেন না সমর্থকরা। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো নামটা থেকে যাবে চিরকাল। জার্সি বদলাবে, রেকর্ড ভাঙবে, নতুন তারকার জন্ম হবে—কিন্তু পর্তুগালের ৭ নম্বরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ কি কোনও দিন ফুরোবে?



