Last Updated on [modified_date_only] by Shroddha Bhattacharyya
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: শরৎ এলেই বাঙালির ঘরে ঘরে শুরু হয় দুর্গাপুজোর (Sharadotsav Tradition) প্রস্তুতি। আর এই সময়েই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দুর্গাপুজোকে শারদোৎসব বা শারদ উৎসব বলার ক্ষেত্রে কিঞ্চিৎ আপত্তি জানিয়েছেন। সেই থেকেই অনেকের মনে উঠছে প্রশ্ন, দেবী দুর্গার আরাধনাকে ‘দুর্গাপুজো’ বলা হবে, নাকি ‘শারদোৎসব’? ‘উৎসব’ বা ‘শারদোৎসব’ শব্দটি আধুনিক এবং ধর্মীয় ভাবনার বাইরে থেকে এসেছে-এমন ধারণাও রয়েছে অনেকের মনে। তবে এই ধারণার সঙ্গে একমত নন বিশিষ্ট গবেষক ও অধ্যাপক ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, সংস্কৃত ব্যাকরণ, পুরাণ এবং বঙ্গীয় স্মৃতিশাস্ত্র-সব দিক থেকেই ‘শারদোৎসব’ এবং ‘দুর্গোৎসব’ শব্দের যথেষ্ট শাস্ত্রীয় ও ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে।
‘শারদ’ শব্দের অর্থ শরৎকালীন (Sharadotsav Tradition)
ড. বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘শারদ’ (Sharadotsav Tradition) কোনও আধুনিক পরিভাষা নয়। সংস্কৃত ব্যাকরণে ‘শরৎ’ শব্দের সঙ্গে তদ্ধিত প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘শারদ’ শব্দের উৎপত্তি। এর অর্থ শরৎকাল-সম্বন্ধীয় বা শরৎকালীন। তাই শরৎকালে অনুষ্ঠিত দেবী দুর্গার আরাধনাকে ‘শারদ পূজা’ বা ‘শারদ উৎসব’ বলা ভাষাগতভাবেও যথার্থ।
‘শারদা’ নামের সঙ্গেও শরতের যোগ (Sharadotsav Tradition)
শরৎকালের সঙ্গে দেবীর সম্পর্কের শাস্ত্রীয় (Sharadotsav Tradition) উল্লেখও রয়েছে বলে জানান ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রাচীন শাস্ত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন-
“শরৎকালে পুরা যস্মান্নবম্যাং বোধিতা সুরৈঃ।
শারদা সা সমাখ্যাতা পীঠে লোকে চ নামতঃ।।’’
অর্থাৎ, প্রাচীনকালে শরৎকালের নবমী তিথিতে দেবতারা দেবীকে বোধন বা জাগ্রত করেছিলেন। সেই কারণেই তিনি পীঠে এবং লোকসমাজে ‘শারদা’ নামে পরিচিত হন। অর্থাৎ শরৎকালে দেবীর বোধন এবং ‘শারদা’ নামের মধ্যে শাস্ত্রীয় যোগ রয়েছে।
পুরাণে দুর্গাপুজো ‘মহোৎসব’ (Sharadotsav Tradition)
‘উৎসব’ শব্দটি দুর্গাপুজোর সঙ্গে আধুনিক সময়ে (Sharadotsav Tradition) যুক্ত হয়েছে-এই ধারণারও বিরোধিতা করেন ড. বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, প্রাচীন কালিকাপুরাণেই শরৎকালীন দুর্গাপুজোকে ‘মহোৎসব’ বলা হয়েছে। উদ্ধৃত শ্লোকে রয়েছে-
“যো মোহাদথবালস্যাদ্ দেবীং দুর্গাং মহোৎসবে।
ন পূজয়তি দম্ভাদ্বা দ্বেষাদ্বাপ্যথ ভৈরব॥
ক্রুদ্ধা ভগবতী তস্য কামানিষ্টান্ নিহন্তি বৈ॥”
এখানে স্পষ্টভাবেই “দেবীং দুর্গাং মহোৎসবে” বলা হয়েছে। অর্থাৎ দেবী দুর্গার আরাধনাকে ‘মহোৎসব’ হিসেবে চিহ্নিত করার শাস্ত্রীয় দৃষ্টান্ত রয়েছে।
শূলপাণির গ্রন্থেও ‘দুর্গোৎসব’
চতুর্দশ শতকের স্মৃতিকার শূলপাণির গ্রন্থের নামই ‘দুর্গোৎসববিবেক’। গ্রন্থের শুরুতে লেখা রয়েছে-
“নত্বেশানীপদাম্ভোজং ভ্রমদ্ভ্রমরশোভিতম্।
দুর্গোৎসববিবেকস্তু ক্রিয়তে শূলপাণিনা॥”
অর্থাৎ দেবীর পাদপদ্মে প্রণাম জানিয়ে শূলপাণি ‘দুর্গোৎসববিবেক’ গ্রন্থ রচনা করছেন।
রঘুনন্দনের রচনাতেও ‘দুর্গোৎসব’
ষোড়শ শতকের স্মৃতিকার রঘুনন্দনের বিভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে ‘দুর্গাপূজাতত্ত্ব’ এবং ‘দুর্গোৎসবতত্ত্ব’-এই দুই ধরনের নামের উল্লেখ পাওয়া যায় বলে জানান ড. বন্দ্যোপাধ্যায়। অর্থাৎ বঙ্গীয় স্মৃতিশাস্ত্রেও দুর্গাপুজোর সঙ্গে ‘উৎসব’ শব্দটির দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে।
আরও পড়ুন: Lalbaugcha Raja Booking: লালবাগচা রাজার দর্শনে যাবেন? অনলাইন-অফলাইন টিকিট বুকিংয়ের পদ্ধতি জেনে নিন
শাস্ত্রহানি নয়, রয়েছে ঐতিহ্যের ভিত্তি
ড. অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, দুর্গাপুজোকে ‘শারদোৎসব’ বা ‘দুর্গোৎসব’ বলা কোনও আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ শব্দের প্রয়োগ নয়। সংস্কৃত ব্যাকরণে ‘শারদ’-এর অর্থ শরৎকালীন, আবার পুরাণ ও স্মৃতিশাস্ত্রেও দুর্গার আরাধনাকে ‘মহোৎসব’ এবং ‘দুর্গোৎসব’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ‘শারদোৎসব’ বললে পূজার মাহাত্ম্য বা শাস্ত্রীয় মর্যাদা কোনওভাবেই কমে না। বরং শরৎকালীন দেবী আরাধনার প্রাচীন ঐতিহ্যই এই শব্দের মধ্যে প্রতিফলিত হয়।


