Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ত্রয়ণ চক্রবর্তী: রাজ্য বিধানসভায় এদিন বিরল ও অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষকে হাউসের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে দিনের জন্য সাসপেন্ড করা হয়। প্রথমে বিধায়ক তাপস রায় কুণাল ঘোষকে সাসপেন্ড করার প্রস্তাব আনেন। সেই প্রস্তাবের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একদিনের জন্য সাসপেনশনের কথা বলেন। পরে অধ্যক্ষ রথীন্দ্রনাথ বসু কুণাল ঘোষকে ওই দিনের জন্য সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন (Kunal Ghosh)।

কিন্তু সাসপেনশনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগেই বিধানসভার ভিতরে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অধ্যক্ষের একাধিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় শেষ পর্যন্ত মার্শাল ডেকে কুণাল ঘোষকে হাউস থেকে বের করে দেওয়া হয়। বিধানসভার সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন দৃশ্য কার্যত নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন অনেকেই।
কেন ক্ষুব্ধ কুণাল ঘোষ? (Kunal Ghosh)
হাউসের বাইরে এসে কুণাল ঘোষ তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁর অভিযোগ, তিনি একজন নির্বাচিত বিধায়ক হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে বারবার বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, “আমি একজন নির্বাচিত বিধায়ক। অধ্যক্ষ যে বিরোধী দল তৈরি করেছেন তারা আমাকে বলতে দিচ্ছে না। গুন্ডা দমন বিল নিয়ে বলতে দেওয়া হয়নি। আজ হোম ডিপার্টমেন্টের আলোচনায়ও আমার নাম দিয়েছিলাম, কিন্তু তা বাদ দেওয়া হয়েছে। আমার কণ্ঠরোধের চেষ্টা চলছে।”
তাঁর আরও অভিযোগ, বিধানসভার ভিতরে একটি “ডামি বিরোধী দল” তৈরি করা হয়েছে। তাঁর দাবি, শাসকদলেরই এক প্রবীণ বিধায়ক তাঁকে নাকি বলেছিলেন, “বারবার নাম দেওয়া হবে, আপনি এদিকে চলে আসুন।” এই ঘটনাকে সামনে এনে কুণাল প্রশ্ন তোলেন, এর পিছনে কার নির্দেশ রয়েছে এবং সরকার কি এই ঘটনার মদত দিচ্ছে?
আখরুজ্জামানের বক্তব্য চলাকালীন শুরু হয় বিক্ষোভ
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন ঋত শিবিরের তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামান বিধানসভায় বক্তব্য রাখছিলেন। সেই সময় হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে কুণাল ঘোষ তাঁর সামনে গিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করেন, “বক্তা তালিকা থেকে আমার নাম কাটলেন কেন? আমার নাম বাদ দেওয়া হল কেন?” আখরুজ্জামান নিজের বক্তব্য চালিয়ে যেতে থাকলেও কুণাল ঘোষ একই প্রশ্ন বারবার করতে থাকেন। এতে বিধানসভার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
অধ্যক্ষের বারবার সতর্কবার্তা (Kunal Ghosh)
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অধ্যক্ষ রথীন্দ্রনাথ বসু একাধিকবার কুণাল ঘোষকে নিজের আসনে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে বলেন, “আপনি না বসলে কিন্তু আপনাকে বের করে দিতে বাধ্য হব।” তবে সেই নির্দেশ মানেননি কুণাল ঘোষ। তিনি নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন এবং বক্তব্য রাখার সুযোগ না পাওয়ার প্রতিবাদ চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত অধ্যক্ষ মার্শাল ডাকার নির্দেশ দেন। এরপর মার্শালরা কুণাল ঘোষকে হাউস থেকে বের করে দেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সদস্যদের অনেকেই বলেন, একজন বিধায়ককে এভাবে মার্শাল দিয়ে বের করে দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল।
দলীয় রাজনীতি ও ‘ভালো তৃণমূল’ (Kunal Ghosh)
বিধানসভার বাইরে কুণাল ঘোষ একের পর এক রাজনৈতিক অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে দলীয় প্রতিহিংসার রাজনীতি চলছে। তাঁর কথায়, “মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন রিপোর্ট প্রকাশ করবেন, দোষীদের শাস্তি দেবেন। আমি জানতে চাই, যাদের তথাকথিত ‘ভালো তৃণমূল’ বলা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও কি ব্যবস্থা নেওয়া হবে?” তিনি আরও অভিযোগ করেন, আগে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল, এখন তাঁদের বিরুদ্ধে আর কোনও পদক্ষেপের কথা বলা হচ্ছে না।

কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে কুণালের মন্তব্য
সাম্প্রতিক সময়ে সংসদে মমতাপন্থী সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাসপেন্ড করা নিয়েও মুখ খোলেন কুণাল ঘোষ। তিনি বলেন, “কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে যেভাবে সাসপেন্ড করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক। তিনি বেইমানদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, “আমি সাদা কাগজে লিখে দিতে পারি, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কোনওদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছেড়ে যাবেন না।”
ইডি-সিবিআই, দল ভাঙানো (Kunal Ghosh)
কুণাল ঘোষ অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক দল ভাঙানোর জন্য কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়াও মদন মিত্রের সাম্প্রতিক মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “মদনদা ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছেন বলেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। যাঁরা অভিযোগ করছেন, তাঁরা আদালতে প্রমাণ করুন।” দিল্লির ছাত্র আন্দোলন নিয়েও মন্তব্য দিল্লিতে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের উপর পুলিশের অভিযানেরও সমালোচনা করেন কুণাল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, “দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের উপর যে আক্রমণ হচ্ছে, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং নিন্দনীয়।”
‘বিড়ালের গায়ে বাঘের ছাল’ (Kunal Ghosh)
নিজের বক্তব্যে একাধিক রাজনৈতিক রূপকও ব্যবহার করেন কুণাল ঘোষ। তিনি বলেন, “বিড়ালের গায়ে বাঘের ছাল পরিয়ে দিলেই সে বাঘ হয়ে যায় না। তখনও তার মুখ থেকে ‘হালুম’ নয়, ‘ম্যাঁও’ই বেরোয়।” এছাড়াও তিনি দাবি করেন, যদি তাঁর হাতে দলীয় শৃঙ্খলার দায়িত্ব থাকত, তাহলে যাঁরা দলকে বিব্রত করছেন তাঁদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হত।
আরও পড়ুন : Taratala Compensation: মৃতদের পরিবার পিছু ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া প্রতিক্রিয়া
কুণাল ঘোষকে হাউস থেকে বের করে দেওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিষয়টি নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, “প্রতিবাদের অনেক পদ্ধতি রয়েছে। এখানে পাঁচবার, আটবারের বিধায়কও রয়েছেন। এমন অসভ্যতা আগে দেখিনি। আমরাও বিরোধী দলে ছিলাম। কিন্তু আজ যেভাবে আখরুজ্জামানকে শারীরিকভাবে বাধা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, একজন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আমি তার তীব্র নিন্দা করছি।” মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বিধানসভার মর্যাদা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখা প্রত্যেক সদস্যের দায়িত্ব এবং কোনও অবস্থাতেই হাউসের কার্যক্রম ব্যাহত করা গ্রহণযোগ্য নয়।



