Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: “নীরা কে?” সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নামের সঙ্গে এই প্রশ্নটিও যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে (Sunil Gangopadhyay)। স্ত্রীকে পর্যন্ত বহুবার শুনতে হয়েছে, “নীরা কি সত্যিই রক্ত-মাংসের কোনও নারী? নাকি কবির বান্ধবী কিংবা প্রেমিকা?” আসলে নীরা কোনও নির্দিষ্ট বাস্তব মানুষ নন। তিনি সুনীলের কল্পনা, অনুভূতি ও ভালোবাসায় নির্মিত এক কাল্পনিক চরিত্র, যিনি প্রেম, বিষাদ, একাকিত্ব ও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
কবির কল্পনায় জন্ম নেওয়া এক চিরন্তন নারী (Sunil Gangopadhyay)
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, শহরের ব্যস্ততা, প্রেমের টানাপোড়েন কিংবা নিঃসঙ্গ রাত, সুনীলের কবিতা, গল্প ও উপন্যাসে নানা রূপে ফিরে এসেছে নীরা। বাস্তবে যার অস্তিত্ব নেই, অথচ পাঠকের কল্পনায় তিনি এতটাই জীবন্ত যে মনে হয়, নীরা বুঝি আমাদেরই পরিচিত কেউ। প্রতিটি প্রেমিকের মনের গোপন কল্পনায় যেমন একজন আদর্শ মানুষের ছবি থাকে, নীরা তেমনই এক চিরন্তন প্রতিরূপ।
বাবার হাতে ইংরেজি কবিতার বই, সেখানেই শুরু (Sunil Gangopadhyay)
সুনীলের সাহিত্যজীবনের সূচনাতেও ছিল পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ছোটবেলায় দুপুরে খেলতে বেরোনোর বদলে বাবার কাছ থেকে তিনি পেতেন ইংরেজি কবিতার বই। সেই কবিতা বাংলায় অনুবাদ করার দায়িত্বই ধীরে ধীরে তাঁকে বাংলা ভাষা ও কবিতার জগতের আরও কাছে নিয়ে আসে। অনুবাদ করতে করতেই একদিন নিজের কবিতা লিখে ফেললেন। কবি হওয়ার স্বপ্ন তখন ধীরে ধীরে বাস্তবের পথে হাঁটতে শুরু করল।
‘কৃত্তিবাস’ থেকে বাংলা কবিতায় নতুন সময় (Sunil Gangopadhyay)
১৯৫৩ সাল থেকে ‘কৃত্তিবাস’ কবিতা পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা কবিতার এক নতুন ধারার অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। তরুণ কবিদের নতুন ভাবনা, নতুন ভাষা ও নতুন জীবনবোধকে সামনে আনার ক্ষেত্রে এই পত্রিকার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুনীল শুধু কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি সাহিত্য-আন্দোলনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কবিতা থেকে উপন্যাস, বিস্তৃত হল তাঁর সাহিত্যভুবন
১৯৫৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’। পরে ‘আত্মপ্রকাশ’-এর মাধ্যমে উপন্যাসের জগতেও নিজের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেন তিনি। ‘আমি কী রকমভাবে বেঁচে আছি’, ‘হঠাৎ নীরার জন্য’, ‘যুগলবন্দী’, ‘রাত্রির রঁদেভূ’, ‘অর্ধেক জীবন’ থেকে ‘সেই সময়’, ‘প্রথম আলো’, ‘পূর্ব-পশ্চিম’, তাঁর সৃষ্টির পরিধি বিস্তৃত হয়েছে কবিতা থেকে ইতিহাস, প্রেম থেকে সমাজ, ব্যক্তিজীবন থেকে বৃহত্তর সময়ের ক্যানভাসে।
ইতিহাসকে গল্পের মতো করে তুলেছিলেন (Sunil Gangopadhyay)
সুনীলের অন্যতম বড় শক্তি ছিল ইতিহাসকে পাঠকের কাছে সহজ ও জীবন্ত করে তোলা। ‘সেই সময়’ কিংবা ‘প্রথম আলো’-র মতো উপন্যাসে ইতিহাস কেবল তারিখ ও ঘটনার তালিকা হয়ে থাকেনি; বরং মানুষ, সম্পর্ক, প্রেম, রাজনীতি ও সমাজের ওঠাপড়ার মধ্য দিয়ে তা গল্পের মতো প্রাণ পেয়েছে। তাঁর লেখায় কলকাতাও যেন একটি জীবন্ত চরিত্র, যার অলিগলি, আড্ডা, সংস্কৃতি ও মানুষ মিশে আছে বাংলা সাহিত্যের শরীরে।
কাকাবাবু-সন্তু থেকে শিশুমনের রোমাঞ্চ (Sunil Gangopadhyay)
সুনীলের সাহিত্যপ্রতিভা শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য লেখা কবিতা ও উপন্যাসে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিশুসাহিত্যে ‘কাকাবাবু-সন্তু’ সিরিজ তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছেও জনপ্রিয় করে তোলে। রোমাঞ্চ, রহস্য, অভিযান আর অজানাকে জানার আকাঙ্ক্ষায় ভরা এই সিরিজ আজও বাংলা কিশোর সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় সৃষ্টি।
আরও পড়ুন: Annapurna Yojana Helpline: অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে অভিযোগ? চালু হেল্পলাইন নম্বর
মানুষটি চলে গেছেন, নীরা রয়ে গেছেন
কলকাতার শেরিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন থেকে সাহিত্য অকাদেমি ও পশ্চিমবঙ্গ শিশুকিশোর আকাদেমির সভাপতির দায়িত্ব, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবন ছিল বহুমাত্রিক। আনন্দ পুরস্কার ও সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত এই সাহিত্যিক ২০১২ সালে চলে গেলেও তাঁর সৃষ্টি রয়ে গেছে। আর সেই সৃষ্টির ভেতর সবচেয়ে রহস্যময়, সবচেয়ে আপন হয়ে হয়তো থেকে যাবে নীরা। কারণ নীরা কোনও একজন নারী নন নীরা আসলে কবির কল্পনায় তৈরি সেই ভালোবাসা, যাকে প্রতিটি পাঠক নিজের মতো করে চিনে নিতে পারেন। তাই সুনীল চলে গেলেও তাঁর নীরা থেকে যাবেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, পাঠকের মনের গভীরে।



