Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: সাহিত্য কোনও দেশের সীমানায় থেমে থাকে না। অথচ সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ফর লিটারেচার অ্যান্ড কালচার’-এর একটি কথিত ‘জরুরি ঘোষণা’কে ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক (Bangladesh Books)। বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়েছে, ১ অক্টোবর ২০২৬-এর পর বাংলাদেশে প্রকাশিত কোনও বই ভারতে বিক্রি করা যাবে না। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে উঠছে একাধিক প্রশ্ন—বইয়ের প্রকাশনা ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে কি পাঠকের পড়ার অধিকারও নিয়ন্ত্রিত হবে?
সমাজমাধ্যমে ছড়ানো বিজ্ঞপ্তি ঘিরে বিতর্ক (Bangladesh Books)
সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে একটি বিজ্ঞপ্তি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল ফর লিটারেচার অ্যান্ড কালচার’-এর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ১ অক্টোবর ২০২৬-এর পর বাংলাদেশে প্রকাশিত কোনও বই ভারতে বিক্রি করা যাবে না। পাশাপাশি বর্তমানে ভারতীয় বাজারে থাকা বাংলাদেশি বইয়ের স্টক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিক্রি করে শেষ করার কথাও বলা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে ভারতীয় প্রকাশনা শিল্পকে ‘ভারতবিদ্বেষী ও মৌলবাদী প্রচার’ এবং ‘ভারতীয় বইয়ের পাইরেসি’ থেকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি লেখকদের ভারতে প্রকাশের ক্ষেত্রে ভারতীয় প্রকাশনা সংস্থার মাধ্যমে বই প্রকাশ ও বিতরণের পক্ষে অবস্থান জানানো হয়েছে। তবে এই বিজ্ঞপ্তির সত্যতা, সংস্থাটির সাংগঠনিক পরিচয়, কর্ণধার বা আইনগত অবস্থান নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি তথ্য না থাকায় প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। বিতর্কের কেন্দ্রে তাই শুধু বাংলাদেশি বই নয়, বরং সাহিত্য ও পাঠের স্বাধীনতার মতো বৃহত্তর বিষয়ও উঠে এসেছে।
বই কি শুধু একটি পণ্য? (Bangladesh Books)
প্রকাশনা শিল্প নিঃসন্দেহে একটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। বই প্রকাশ, কপিরাইট, পাইরেসি, আমদানি-রপ্তানি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলির সঙ্গে আইন ও অর্থনীতির সম্পর্ক রয়েছে। কোনও বইয়ে বেআইনি বা উসকানিমূলক বিষয় থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
কিন্তু বইকে যদি শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সাহিত্যের একটি মৌলিক দিক অদৃশ্য হয়ে যায়। একটি বই পাঠকের কাছে জ্ঞান, চিন্তা, ইতিহাস, কল্পনা ও অন্য এক সমাজকে বোঝার দরজা খুলে দেয়। একজন পাঠক কোনও দেশের সাহিত্য পড়ছেন মানেই তিনি সেই দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক অবস্থান বা সামাজিক বক্তব্যকে সমর্থন করছেন—এমন ধারণা যুক্তিসঙ্গত নয়। বরং ভিন্নমত ও ভিন্ন অভিজ্ঞতার সাহিত্য পড়ার মধ্য দিয়েই একজন পাঠকের নিজস্ব বিচারবোধ আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
“সাহিত্যকে কোনও কাঁটাতার দিয়ে আটকানো যায় না”
এই বিতর্কে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক গৌতম মিত্রের বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তিনি এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার বক্তব্য সমর্থন করেন না। তাঁর মতে, সাহিত্যকে কোনও কাঁটাতার দিয়ে আটকানো যায় না। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ কেন—পৃথিবীর প্রায় ২০০টি দেশের বইই একজন পাঠক চাইলে পড়ার অধিকার রাখেন। তাঁর নিজের বইয়ের সংগ্রহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশের লেখকদের লেখা বলেও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—কোনও বইয়ে যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনও নির্দিষ্ট দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা ভাষার বিরুদ্ধে কুৎসা বা বিদ্বেষ ছড়ানো হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা গায়ের জোরে নয়, আইনি কাঠামো এবং যুক্তিনির্ভর আলোচনার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত।
মৃদুল দাসগুপ্তের প্রতিবাদ (Bangladesh Books)
বিশিষ্ট কবি মৃদুল দাসগুপ্তও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ঘোষণার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ। তাঁর যুক্তি, রাজনৈতিকভাবে বাংলা ভূখণ্ড ভাগ হলেও বাংলা ভাষা ভাগ হয়ে যায়নি। দুই বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংগীত ও শিল্পের মধ্যে যে দীর্ঘ আদানপ্রদান, তা কোনও প্রশাসনিক সীমানা দিয়ে মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—বাংলাদেশের কবি আল মাহমুদের কবিতা কি এপার বাংলার কবি-পাঠক পড়বেন না? আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম কি শুধুমাত্র ভৌগোলিক সীমার কারণে পাঠকের নাগালের বাইরে চলে যাবে? এই প্রশ্নগুলি আসলে আরও বৃহত্তর একটি প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়—একজন পাঠকের সাহিত্য নির্বাচনের অধিকার কি রাজনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামার সঙ্গে বদলে যাবে?
দুই বাংলার সাহিত্যিক সম্পর্কের ইতিহাস (Bangladesh Books)
বাংলা সাহিত্যকে কেবল রাষ্ট্রীয় সীমানা দিয়ে বিচার করা কঠিন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রজন্মের অসংখ্য লেখকের সাহিত্য দুই বাংলার পাঠকের কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, গ্রামীণ সমাজ, নাগরিক জীবন, রাজনৈতিক ইতিহাস কিংবা মানুষের ব্যক্তিগত সংকট—এসব নিয়ে লেখা সাহিত্য এপার বাংলার পাঠককে প্রতিবেশী দেশের সমাজকে অন্যভাবে বোঝার সুযোগ দেয়। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যও বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত ও জনপ্রিয়। এই সাংস্কৃতিক বিনিময় কোনও একদিনে তৈরি হয়নি। ভাষা ও সাহিত্যের দীর্ঘ ইতিহাসের ভিতের উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে এই সম্পর্ক।

আপত্তিকর বইয়ের ক্ষেত্রে কী হবে? (Bangladesh Books)
এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের প্রশ্ন রয়েছে। সাহিত্য স্বাধীন—কিন্তু আইন কোনও দেশের ক্ষেত্রেই অকার্যকর নয়। কোনও বইয়ে যদি সরাসরি হিংসায় উসকানি, বিদ্বেষমূলক প্রচার, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কুৎসা কিংবা বেআইনি বিষয় থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব কোনও অজ্ঞাত বা অস্পষ্ট সংগঠনের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। কোনও বই নিষিদ্ধ করার প্রশ্ন উঠলে তার জন্য স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া, নির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রমাণ এবং বিচারব্যবস্থার ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। মতের অমিল বা রাজনৈতিক বিরোধকে বই নিষিদ্ধ করার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে তা শেষ পর্যন্ত পাঠকের স্বাধীনতাকেই সংকুচিত করবে।
নিষেধাজ্ঞা নয়, প্রয়োজন যুক্তির লড়াই (Bangladesh Books)
সাহিত্যের সঙ্গে মতাদর্শের সংঘাত নতুন কিছু নয়। বহু যুগ ধরে বিভিন্ন দেশে নানা বই নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে চিন্তাকে স্থায়ীভাবে আটকে রাখা যায় না। বরং একটি বিতর্কিত বইয়ের উত্তর আরও শক্তিশালী বই দিয়ে দেওয়া যায়। ভুল তথ্যের জবাব তথ্য দিয়ে দেওয়া যায়। বিদ্বেষের জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়া যায়। আর কোনও মতের বিরোধিতা করতে হলে সেই বিরোধিতার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে মুক্ত আলোচনা। এই কারণেই গৌতম মিত্রের বক্তব্যের ‘সুষম ডিসকোর্স’-এর ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। গণতান্ত্রিক সমাজে মতবিরোধ থাকবেই। কিন্তু মতবিরোধের সমাধান যদি পাঠ বন্ধ করে, বই সরিয়ে বা ভয় দেখিয়ে করার চেষ্টা হয়, তাহলে সাংস্কৃতিক পরিসরই সংকুচিত হয়ে যায়।
পাঠকের স্বাধীনতাই শেষ কথা (Bangladesh Books)
একজন পাঠক একটি বই পড়বেন কি না, তা মূলত তাঁর ব্যক্তিগত বোধ, রুচি ও বিচারবুদ্ধির বিষয়। তিনি কোনও বই পড়ে তার বক্তব্য গ্রহণও করতে পারেন, প্রত্যাখ্যানও করতে পারেন, সমালোচনাও করতে পারেন। কিন্তু বইটি তাঁর হাতে পৌঁছনোর আগেই যদি রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক নির্দেশে সেই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে পাঠকের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারই খর্ব হয়। তাই বাংলাদেশি বই নিয়ে সাম্প্রতিক এই বিতর্ককে শুধুমাত্র ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের আবেগ দিয়ে দেখা উচিত নয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রকাশনা শিল্পের স্বার্থ, কপিরাইটের প্রশ্ন, আইনশৃঙ্খলা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সর্বোপরি পাঠকের অধিকার।
আরও পড়ুন: Utpal Dutt: মানবসভ্যতার ভণ্ডামির বিরুদ্ধে উৎপলের চাবুক আজও থামেনি
কাঁটাতারের ওপারেও থাকে সাহিত্য
রাষ্ট্রের সীমান্ত থাকে, রাজনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামা থাকে, কূটনৈতিক টানাপোড়েনও থাকে। কিন্তু সাহিত্য তার নিজস্ব পথে মানুষের কাছে পৌঁছতে চায়। একজন ভারতীয় পাঠক বাংলাদেশের কোনও লেখকের বই পড়লে তিনি শুধু একটি বই পড়ছেন না তিনি হয়তো একটি ভিন্ন সমাজ, ইতিহাস, মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। একই কথা বাংলাদেশের পাঠকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাই কোনও বই বেআইনি হলে আইন তার বিচার করবে, প্রকাশনা শিল্পে পাইরেসি হলে আইন ও কপিরাইট ব্যবস্থা তার মোকাবিলা করবে। কিন্তু কেবল লেখকের দেশ বা বইয়ের প্রকাশস্থানের ভিত্তিতে পাঠের দরজা বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।



