Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী)-র প্রবীণ সংগঠক, প্রাক্তন সাংসদ, প্রাক্তন বিধায়ক এবং কলকাতা পুরসভার পাঁচবারের জনপ্রতিনিধি সুধাংশু শীল আর নেই (Sudhangshu Seal)। বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে উত্তর কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন বর্ষীয়ান এই বাম নেতা। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই জীবনাবসান ঘটে এক অভিজ্ঞ রাজনৈতিক যোদ্ধার। দলীয় সূত্রে জানানো হয়েছে, শেষ শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় বৃন্দাবন বসাক স্ট্রিটের সিপিআই(এম) পার্টি অফিসে তাঁর মরদেহ শায়িত রাখা হবে। পার্টির রাজ্য কমিটির সদস্য তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং স্থানীয় নেতৃত্ব অজিত চৌধুরী এই খবর নিশ্চিত করেছেন।

উত্তর কলকাতার জননেতা (Sudhangshu Seal)
তিনি ছিলেন সেইসব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন, যাঁরা রাজনীতিকে শুধুমাত্র ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখেননি, বরং মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলাকেই রাজনৈতিক শক্তির আসল ভিত্তি বলে মনে করতেন। কলকাতার উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি বাম রাজনীতির এক পরিচিত মুখ ছিলেন। সাধারণ মানুষের সমস্যাকে নিজের সমস্যা হিসেবে দেখতেন তিনি। ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। পাশাপাশি পাঁচবার পুরপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া তাঁর জনপ্রিয়তারই প্রমাণ। পরবর্তীকালে জোড়াবাগান কেন্দ্র থেকে বিধায়ক হন এবং ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কলকাতা উত্তর-পশ্চিম লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সংগঠনই ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু (Sudhangshu Seal)
সুধাংশু শীলের রাজনৈতিক বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে “মানুষের সঙ্গে সংযোগ” এবং “বুথভিত্তিক সংগঠন”-এর গুরুত্ব। তাঁর মতে, নির্বাচনে জয়ের মূল চাবিকাঠি শুধুমাত্র প্রচার নয়, মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা।

তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন (Sudhangshu Seal)
“সাধারণ মানুষের সমর্থন ছাড়া নির্বাচনে জেতা যায় না। মানুষের ভোট পেতে গেলে সাংগঠনিকভাবে নিজেদের খুব শক্তিশালী করতে হয়।” আরও বলেছিলেন, “মানুষই সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মানুষই মত দিয়ে পাল্টাতে পারে। তাই মানুষের সঙ্গে লাগাতার যোগাযোগ রাখতে হবে।” বাম রাজনীতির বর্তমান দুর্বলতা নিয়েও তিনি খোলামেলা আত্মসমালোচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, সংগঠনের শিথিলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে বামপন্থীদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। তবে একই সঙ্গে তিনি আশাবাদীও ছিলেন যে মানুষ আবার বামপন্থীদের দিকে ফিরবেন।
জোট রাজনীতি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান (Sudhangshu Seal)
সুধাংশু শীল কখনও সংকীর্ণ রাজনৈতিক ভাবনার মধ্যে আবদ্ধ ছিলেন না। কংগ্রেসের সঙ্গে বামেদের রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়েও তিনি বাস্তববাদী অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে অনেক সময় বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য জরুরি হয়ে পড়ে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, “এককভাবে লড়াই করে পারা যায় না। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে অনেক সময় চিন্তা করতে হয়।” তবে একই সঙ্গে তিনি বামপন্থীদের নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে আপসহীনতার কথাও তুলে ধরেছিলেন।
মিডিয়ার ভূমিকা নিয়েও ছিল তীব্র সমালোচনা (Sudhangshu Seal)
বর্তমান সময়ের সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাকে নিয়েও সরব হয়েছিলেন সুধাংশু শীল। তাঁর অভিযোগ ছিল, কর্পোরেট মালিকানাধীন মিডিয়ার একাংশ একতরফাভাবে শাসকদলের প্রচার চালাচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের কাছে বিকল্প রাজনৈতিক মত পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁর কথায়, “সারাদিন মোদি মোদি করে মানুষকে পাগল করে দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে জাগানোর মতো মিডিয়া এখন আমাদের নেই।” এই বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, তিনি রাজনৈতিক লড়াইকে শুধুমাত্র ভোটের লড়াই হিসেবে দেখতেন না; বরং মতাদর্শ, সংগঠন ও জনসংযোগের দীর্ঘ সামাজিক প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখতেন।
২০১০ সালে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যাওয়া
২০১০ সালের কলকাতা পুরনির্বাচনে বামফ্রন্টের তরফে মেয়র পদপ্রার্থী করা হয়েছিল সুধাংশু শীলকে। কিন্তু সেই সময় রাজ্যে প্রবল তৃণমূল ঝড়ে বামেদের বড় ধাক্কা খেতে হয়। নির্বাচনে পরাজয়ের পর ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। যদিও দলীয় কর্মীদের কাছে তিনি শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন পরামর্শদাতা ও অভিভাবকের মতো।
শোকের ছায়া বাম শিবিরে (Sudhangshu Seal)
সুধাংশু শীলের প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু এবং সিপিআই(এম)-এর রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তাঁরা বলেছেন, সুধাংশু শীল ছিলেন এক নিষ্ঠাবান সংগঠক, যিনি আজীবন মানুষের রাজনীতি করেছেন। দলের বহু কর্মী-সমর্থকের কাছে তিনি ছিলেন “কমরেড সুধাংশু” সহজ, সংযত অথচ দৃঢ়চেতা এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
আরও পড়ুন: Mamata Banerjee: প্রথমে পদত্যাগে নারাজ, এখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘মুখ্যমন্ত্রী’ মমতা!
এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের স্মৃতি
সুধাংশু শীলের জীবন বাম রাজনীতির এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সাক্ষী। পুরসভা থেকে বিধানসভা, বিধানসভা থেকে লোকসভা প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয় গড়েছিলেন সংগঠন, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আদর্শের ভিত্তিতে। আজ তাঁর প্রয়াণে শুধুমাত্র একজন প্রাক্তন সাংসদ বা পুরনেতার মৃত্যু ঘটল না; অবসান হল এমন এক রাজনৈতিক ধারার, যেখানে মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ককেই রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মনে করা হত। তাঁর জীবন ও বক্তব্য ভবিষ্যতের রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে দীর্ঘদিন প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।



