Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: কলকাতার ভোর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। আকাশে হালকা ধূসর আলো, রাস্তাঘাটে সবে শুরু হয়েছে দিনের আনাগোনা (Sourav Ganguly Biopic)। সেই সময়ই এক ধূসররঙা বড় গাড়ি এসে থামল উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী এরিয়ান ক্লাবের কাছে। গাড়ি থেকে নামলেন বলিউড অভিনেতা রাজকুমার রাও। তবে তিনি আর শুধুই রাজকুমার নন, তিনি এখন পর্দার ‘মহারাজ’, অর্থাৎ সৌরভ গাঙ্গুলী। শুরু হল বহু প্রতীক্ষিত বায়োপিক ‘দাদা’র শুটিং।
ভোরের কলকাতায় ‘দাদা’র আবির্ভাব (Sourav Ganguly Biopic)
ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল সাড়ে পাঁচটা ছুঁইছুঁই। এরিয়ান ক্লাবের আশপাশে ইতিমধ্যেই ব্যস্ততা শুরু হয়ে গিয়েছে। ইউনিটের সদস্যদের ছুটোছুটি, আলো বসানো, ক্যামেরা প্রস্তুত সব মিলিয়ে যেন এক সিনেম্যাটিক আবহ। আর তার মাঝেই নিঃশব্দে মেকআপ ভ্যান থেকে বেরিয়ে এলেন রাজকুমার রাও। স্লেটরঙা টি-শার্ট, কালো শর্টস, ছোট করে ছাঁটা চুল, শরীরে সামান্য মেদের আবরণ চেহারায় ফুটে উঠেছে ক্রিকেটার সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচিত উপস্থিতি। মুখে সানগার্ডের সাদা প্রলেপ, আর চোখেমুখে একাগ্রতা। মাঠে নেমেই শুরু করলেন ওয়ার্ম আপ ও দৌড়ঝাঁপের দৃশ্যের শুটিং।
কিশোর ক্রিকেটারদের উচ্ছ্বাসে মুখর মাঠ (Sourav Ganguly Biopic)
এরিয়ান ক্লাবের মাঠে তখন উপস্থিত একদল উঠতি ক্রিকেটার। সামনে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছেন তাঁদের প্রিয় ‘দাদা’। মুহূর্তেই মাঠে ধ্বনিত হতে লাগল “সৌরভ! সৌরভ!” এক খুদে ভক্ত তো উত্তেজনায় নিজের জামা খুলে মাথার উপর ঘোরাতে শুরু করে দেয় ঠিক যেমনটা একদিন লর্ডসের বারান্দায় করেছিলেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। সেই দৃশ্য দেখে হেসে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান রাজকুমার। সিনেমার শুটিং আর বাস্তবের আবেগ যেন একাকার হয়ে যায়। এই দৃশ্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে ছবির সময়কাল লর্ডসে ভারতের ঐতিহাসিক জয়ের পর খালি গায়ে জার্সি ঘোরানো সৌরভ তখন বিশ্বজোড়া আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সেই স্মৃতিই যেন ফিরে এল কলকাতার মাঠে।

পরিচালকের চোখে নিখুঁত ‘মহারাজ’ (Sourav Ganguly Biopic)
ছবির পরিচালক বিক্রমাদিত্য মোটওয়ানে নিজে উপস্থিত থেকে প্রতিটি দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তিনিও সাধারণ পোশাকে মাঠে ঘুরে ঘুরে নির্দেশ দিচ্ছিলেন। বারবার ক্যামেরাবন্দি করা হল রাজকুমারের দৌড়নো, শরীরচর্চা এবং মাঠে সময় কাটানোর দৃশ্য। পাঁচ-ছ’বার টেক নেওয়ার পর পরিচালক “কাট” বলতেই মাঠের মাঝখানে বসে বিশ্রাম নিলেন অভিনেতা। জানা যায়, শুটিং শুরু হওয়ার অনেক আগেই মাঠে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। জিমের বদলে মাঠেই সারেন নিজের নিয়মিত শরীরচর্চা। এমনকি ফাঁকে ফাঁকে চিত্রনাট্য পড়তেও দেখা যায় তাঁকে।
কেন এরিয়ান ক্লাব? (Sourav Ganguly Biopic)
শুটিং ঘিরে কৌতূহল ছিল ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের কর্মীদের মধ্যেও। তাঁদের কথায়, সৌরভের ক্রিকেটজীবনের শুরু হয়েছিল এই এরিয়ান ক্লাব থেকেই। যদিও প্রথম জীবনে তিনি ফুটবল খেলতেন, পরে ক্রিকেটেই নিজের পরিচয় গড়ে তোলেন। এই কারণেই বায়োপিকের গুরুত্বপূর্ণ অংশের শুটিংয়ের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে এই ঐতিহাসিক মাঠকে। পাশাপাশি ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের ক্রিকেট দলের হয়েও খেলেছিলেন সৌরভ সেই স্মৃতিও এখনও উজ্জ্বল ক্লাবকর্মীদের মনে।
বেহালার বাড়িতে শৈশবের ‘সৌরভ’ (Sourav Ganguly Biopic)
শুধু এরিয়ান ক্লাব নয়, শুটিং হয়েছে বেহালার বীরেন রায় রোডে অবস্থিত সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতেও। সেখানেই ক্যামেরাবন্দি হয়েছে তাঁর ছোটবেলার নানা মুহূর্ত। অভিনেত্রী অপরাজিতা আধ্যা অভিনয় করছেন সৌরভের মা নিরূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের চরিত্রে। লালপাড় সাদা শাড়ি, কপালে বড় লাল টিপ, কোমর ছোঁয়া বিনুনি তাঁর উপস্থিতি যেন ফিরিয়ে এনেছে নব্বইয়ের দশকের বাঙালি পরিবারের চেনা আবহ। সাদা স্কুল ড্রেসে কিশোর সৌরভের দৃশ্যের পাশাপাশি দেখা যায় এক কিশোরীকে দুদিকে বিনুনি বাঁধা, বারান্দা থেকে তাকিয়ে আছে সেই স্কুলছাত্রের দিকে। সহজেই বোঝা যায়, এটি সৌরভ ও ডোনা গাঙ্গুলী-র স্কুলজীবনের প্রেমকাহিনির দৃশ্য।

বাস্তব আর সিনেমার মেলবন্ধন (Sourav Ganguly Biopic)
শুটিং চলাকালীন গোটা এলাকায় তৈরি হয়েছিল উৎসবের আবহ। বাড়ির সামনে সাজানো হয়েছিল নকল সবজির দোকান, চায়ের স্টল যেন নব্বইয়ের কলকাতাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। প্রতিটি শটের আগে পরিচালক খুঁটিয়ে দেখছিলেন পরিবেশ ঠিকঠাক রয়েছে কিনা। স্থানীয় বাসিন্দারা ভোর থেকেই দাঁড়িয়ে ছিলেন একঝলক দেখার আশায়। কারও হাতে মোবাইল, কেউ আবার দূর থেকে নিঃশব্দে দেখছিলেন তাঁদের প্রিয় ‘দাদা’র জীবনের মুহূর্তগুলো নতুনভাবে তৈরি হতে।
রাজকুমারের রূপান্তর নজর কাড়ছে (Sourav Ganguly Biopic)
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের চরিত্রে নিজেকে নিখুঁতভাবে গড়ে তুলতে যথেষ্ট পরিশ্রম করছেন রাজকুমার রাও। তাঁর হাঁটাচলা, শরীরী ভাষা, এমনকি মাঠে দাঁড়িয়ে থাকার ধরনেও ফুটে উঠছে প্রাক্তন ভারত অধিনায়কের ছাপ। সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে তাঁর চোখের অভিব্যক্তি যেখানে কখনও আত্মবিশ্বাসী অধিনায়ক, কখনও আবার নিজের শৈশবকে ফিরে পাওয়া এক আবেগপ্রবণ মানুষকে দেখা যাচ্ছে।
‘দাদা’ শুধুই সিনেমা নয়, বাঙালির আবেগ
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় শুধুমাত্র একজন ক্রিকেটার নন, তিনি বাঙালির আত্মবিশ্বাস, লড়াই এবং আত্মমর্যাদার প্রতীক। নব্বইয়ের দশকের ভারতীয় ক্রিকেটে আগ্রাসনের নতুন সংজ্ঞা এনে দিয়েছিলেন তিনি। তাই তাঁর জীবনী নিয়ে ছবি তৈরি হওয়া মানেই বাঙালির কাছে এক আবেগঘন অধ্যায়। শহর কলকাতার রাস্তায় সেই আবেগ এখন স্পষ্ট। ভোরবেলা থেকে মানুষের ভিড়, কৌতূহল, উন্মাদনা সবই প্রমাণ করে, ‘দাদা’ এখনও বাংলার হৃদয়ে সমানভাবে রাজত্ব করেন।

আরও পড়ুন: KMC TMC: কলকাতা পুরসভায় বড় ভাঙন: জেলা থেকে শহর তাসের ঘর ঘাসফুল শিবির
সামনে আরও চমক
সূত্রের খবর, আগামী দিনে শুটিং হতে পারে ইডেন গার্ডেন-এও। এছাড়া কলকাতার আরও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় শুটিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। খুব সম্ভবত পরবর্তী পর্যায়ে যোগ দেবেন অভিনেতা শাশ্বত চ্যাটার্জী, যিনি অভিনয় করবেন সৌরভের বাবা চণ্ডীদাস গঙ্গোপাধ্যায়ের চরিত্রে।



