Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: দুর্গাপুজো বা কালীপুজোর মতোই জগদ্ধাত্রী পুজোও বাঙালির সংস্কৃতি, আচার এবং ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত (Jagaddhatri Puja)। কিন্তু এই পুজোর মধ্যেও এমন কিছু প্রথা আছে, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে। তেমনই এক ঐতিহ্যের সাক্ষী হুগলির ভদ্রেশ্বরের তেঁতুলতলা বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পুজো, যা স্থানীয়দের কাছে স্নেহভরে পরিচিত ‘বুড়ি মা’-এর পুজো নামে।

দুই শতাব্দীরও বেশি প্রাচীন (Jagaddhatri Puja)
এই বছর তেঁতুলতলা বারোয়ারি জগদ্ধাত্রী পুজো ২৩৩তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। এটি ভদ্রেশ্বর তথা সমগ্র হুগলি জেলার অন্যতম প্রাচীন পুজো। জনশ্রুতি অনুযায়ী, নদীয়ার মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়-এর দেওয়ান দাতারাম শূর এই অঞ্চলে পুজোটি শুরু করেন। প্রথমে এটি ছিল পারিবারিক, পরে তা বারোয়ারি পুজোর রূপ নেয়। সময়ের প্রবাহে এই পুজোই আজ “বুড়ি মা পুজো” নামে স্থানীয় মানুষের আবেগ ও ভক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে।
দেবীবরণের বিরল প্রথা (Jagaddhatri Puja)
এই পুজোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল দশমীর দিনে পুরুষদের দ্বারা দেবীবরণ। অন্যত্র যেখানে মহিলারা দেবীকে বরণ করেন, এখানে ঘটে তার উল্টোটা। শতাব্দী-প্রাচীন রীতি অনুযায়ী, এই অঞ্চলের পুরুষরাই শাড়ি, সিঁদুর, শাঁখা, পলা পরে এবং ঘোমটা টেনে মাকে বরণ করেন। হাতে বরণডালা, ঠোঁটে ‘উলুধ্বনি’ এমন দৃশ্যই এই পুজোকে করে তোলে একেবারে অনন্য।
ব্রিটিশ আমলের সামাজিক বাস্তবতা (Jagaddhatri Puja)
এই অদ্ভুত অথচ আবেগঘন রীতির পেছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক কারণ। বলা হয়, ব্রিটিশ ও ফরাসি সেনা ছাউনি থাকার সময় ভদ্রেশ্বর ও গৌরহাটি অঞ্চলে নারীদের বাইরে বেরোনো ছিল বিপজ্জনক। সেনাদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের কারণে মহিলারা জনসমক্ষে আসতে ভয় পেতেন। তখনই পুজোর সময় মহিলাদের জায়গায় পুরুষরাই তাঁদের দায়িত্ব নেন। তাঁরা মেয়েদের পোশাক পরে, শাঁখা-সিঁদুরে সেজে মা জগদ্ধাত্রীকে বরণ করতে শুরু করেন। এই মানবিক বোধ থেকেই জন্ম নেয় এমন এক রীতি, যা আজও ভক্তি ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে টিকে আছে।
আজও সেই প্রথা অক্ষুণ্ণ (Jagaddhatri Puja)
দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও, প্রথাটি আজও একই নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় পালন করা হয়। দশমীর দিন ভদ্রেশ্বরের রাস্তায় দেখা যায় এক অনন্য দৃশ্য পুরুষরা বিবাহিতা নারীর বেশে, কপালে সিঁদুরের টিপ, হাতে বরণডালা, মুখে ভক্তির হাসি মাকে কনকাঞ্জলি দিচ্ছেন। এই অনন্য মুহূর্ত দেখতে প্রতি বছর ভিড় জমান স্থানীয় বাসিন্দা ছাড়াও বহু দর্শনার্থী।
ভক্তির প্রতীক ও ঐতিহ্যের ধারক (Jagaddhatri Puja)
‘বুড়ি মা’ নামটি শোনা মাত্র অনেকের মনে পড়ে যায় কৃষ্ণনগরের বিখ্যাত বুড়ি মা পুজো। কিন্তু ভদ্রেশ্বরের তেঁতুলতলার এই ‘বুড়ি মা’-ও কম নয়। প্রাচীনত্ব, আবেগ ও সামাজিক মূল্যবোধে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। উভয় ক্ষেত্রেই ‘বুড়ি মা’ শব্দটি কেবল এক দেবীর নয়, বরং সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ঐতিহ্যের প্রতীক, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়ে চলেছে।
আরও পড়ুন: Jagaddhatri Puja: এই পুজো কি সত্যিই চন্দননগরেই শুরু হয়েছিল? জানা আছে এর উৎস?
ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল
ভদ্রেশ্বরের তেঁতুলতলা জগদ্ধাত্রী পুজো আজ কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি বাংলার সমাজচিত্রের এক জীবন্ত দলিল। এখানে একদিকে যেমন মাতৃশক্তির আরাধনা হয়, তেমনই ফুটে ওঠে পুরুষ ও নারীর সমান ভূমিকা ও দায়িত্ববোধের প্রতীকী বার্তা।
এই ঐতিহ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় ধর্ম কেবল বিশ্বাস নয়, বরং মানবিকতা, দায়িত্ব ও ঐক্যের বন্ধন।



