Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: ভারতের বাম রাজনীতির ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁদের পরিচয় শুধুমাত্র রাজনৈতিক পদ বা সংগঠনিক দায়িত্বে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা একটি আদর্শের প্রতীক, একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারক এবং এক দীর্ঘ সংগ্রামের জীবন্ত ইতিহাস। সেই তালিকার অন্যতম নাম বিমান বসু। আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়েও যিনি আজও একই রকম সাদামাটা পোশাকে, একই বিশ্বাসে এবং একই রাজনৈতিক আদর্শে অটল, তিনি শুধুই একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং এক যুগের প্রতিনিধি (Biman Bose)।

কঠোর আদর্শের কমরেড (Biman Bose)
বয়স তাঁর চুলে রূপোলি রেখা এঁকেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে, বহু নেতা ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশ করেছেন, আবার হারিয়েও গিয়েছেন। কিন্তু বিমান বসুকে দেখা গেছে বরাবর একই সরলতায়। সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা, অতি সাধারণ জীবনযাপন এবং প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকার এক স্বভাবসিদ্ধ প্রবণতা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। নিজেকে নিয়ে প্রচার করতে তিনি কখনও ভালোবাসেননি। জন্মদিন এলেও কোনও জাঁকজমক নয়, বরং ঘরোয়া পরিবেশে প্রিয় পায়েসই তাঁর সবচেয়ে বড় আনন্দ। এই সরলতাই তাঁকে মানুষের কাছে আরও আপন করে তুলেছে।
ছাত্রজীবনেই রাজনীতির পথে যাত্রা (Biman Bose)
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ মৌলানা আজাদ কলেজে পড়াকালীন ছাত্ররাজনীতি এবং সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন বিমান বসু। তবে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু আরও আগে। ১৯৫৪ সালে, যখন তিনি স্কুলের ছাত্র, তখনই বিধানসভার উপনির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে প্রচারে নেমে পড়েন। মাত্র তিন বছর পরে, ১৯৫৭ সালে, তাঁকে পার্টির সদস্য করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু বয়স তখনও ১৮ পূর্ণ হয়নি বলে সেই আবেদন গৃহীত হয়নি। তবুও রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা একটুও টলেনি।
আন্দোলনের পথে, কারাবাসের অভিজ্ঞতা
বাংলা ও বিহার সংযুক্তিকরণের বিরুদ্ধে ১৯৫৬ সালের আন্দোলন কিংবা ১৯৫৯ সালের ঐতিহাসিক খাদ্য আন্দোলন—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন বিমান বসু। ১৯৫৮ সালে প্রথমবার তাঁকে গ্রেফতার হতে হয়। এরপরও আন্দোলন থামেনি। বরং সংগ্রামের পথ আরও দৃঢ় হয়েছে।

ছাত্র আন্দোলন থেকে জাতীয় নেতৃত্বে (Biman Bose)
১৯৬৪ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক ছাত্র ফেডারেশনের কলকাতা জেলা কমিটির সম্পাদক এবং পরে রাজ্য সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। একই সময়ে ভারত-ভিয়েতনাম সংহতি কমিটির সহকারী সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের (এসএফআই) প্রথম সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ছাত্র আন্দোলনের এই নেতৃত্বই পরবর্তীকালে তাঁকে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
সিপিআই(এম)-এর সংগঠক হিসেবে দীর্ঘ পথচলা
১৯৭১ সালে তিনি সিপিআই(এম)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সদস্য হন। এরপর ধারাবাহিকভাবে, ১৯৭৮ সালে রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, ১৯৮৫ সালে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, ১৯৯৮ সালে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা পলিটব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হন। দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান এবং সিপিআই(এম)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির বিশেষ আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মোবাইল নেই, ব্যাংক অ্যাকাউন্টও নেই! (Biman Bose)
বর্তমান সময়ে যেখানে প্রযুক্তি ও ব্যক্তিগত সম্পদ প্রায় সকলের জীবনের অপরিহার্য অংশ, সেখানে বিমান বসুর জীবন একেবারেই ভিন্ন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমার দু’টো জিনিস নেই, মোবাইল ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। কারণ আমি আয় করি না। ফলে যার আয় নেই, তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না-থাকাই উচিত। পার্টির তরফে যা পাই, তা দিয়েই চালিয়ে নিই। আর মোবাইলে আমার অত আগ্রহ নেই। সব কিছু আমাকে বিশেষভাবে টানে না।”

বাড়ি ছাড়ার সেই আবেগঘন অধ্যায় (Biman Bose)
তরুণ বয়সে একদিন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন বিমান বসু। কারণ ছিল অত্যন্ত মানবিক। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য পরিবার, বিশেষ করে তাঁর মা, প্রতিবেশীদের নানা কথা শুনতে বাধ্য হতেন। সেই অসুবিধা থেকে পরিবারকে মুক্তি দিতেই তিনি বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন। মজার বিষয়, তাঁর মা প্রথমে ভেবেছিলেন ছেলে হয়তো প্রেমের কারণে বাড়ি ছেড়েছে! সত্য জানার জন্য তিনি ছেলের পিছনে লোকও লাগিয়েছিলেন। পরে বিমান বসু নিজেই মাকে জানান, “আমি নতুন ঘর বাঁধার জন্য বাড়ি ছাড়িনি।” এরপর থেকেই আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের পার্টি অফিসই হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী ঠিকানা। তবে বাড়ি ছাড়লেও মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক কখনও ছিন্ন হয়নি। বিভিন্ন সময়ে পার্টির কাজ কিংবা মানুষের সাহায্যের প্রয়োজনে মায়ের কাছ থেকেই অর্থ নিয়ে এসেছেন এ কথাও তিনি নিজেই জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন : Vijaya Mehta: ভারতীয় নাট্যমঞ্চের এক যুগের অবসান, চিরস্মরণীয় বিজয়া মেহতা
ফুটবলপ্রেমী এক সংগ্রামী মানুষ
রাজনীতির বাইরে তাঁর আর একটি বড় ভালোবাসা ছিল ফুটবল। মাঠে খেলার প্রতি তাঁর আগ্রহ বহুবার বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে। রাজনৈতিক ব্যস্ততার মধ্যেও খেলাধুলার প্রতি এই অনুরাগ তাঁকে আরও মানবিক করে তোলে।



