Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কেটিভি বাংলা ডিজিটাল: বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে নাট্যকার চন্দন সেন এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছেন (Chandan Sen)। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আবহে কিছু মানুষ অত্যন্ত তড়িঘড়ি নিজেদের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরছেন। সেই অতিরিক্ত উৎসাহে এমন কিছু কাজ করা হচ্ছে, যা কেবল রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে না, বরং বাংলার ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই হোক না কেন, বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে দলীয় প্রতীকে রূপান্তর করা উচিত নয়।
বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতি (Chandan Sen)
কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে একাডেমি অফ ফাইন আর্টস, রবীন্দ্র সদন, নন্দন, শিশির মঞ্চ-সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান। এখানে শুধু নাটক, চলচ্চিত্র বা শিল্পচর্চাই হয় না; বহু প্রজন্মের শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যকার ও সংস্কৃতিপ্রেমীর আবেগও জড়িয়ে রয়েছে। চন্দন সেনের বক্তব্য, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলির নিজস্ব স্থাপত্য, নান্দনিকতা ও ঐতিহাসিক পরিচয় রয়েছে। সরকার বদলালেই যদি সেই ভবনের রং, প্রতীক কিংবা পরিবেশ দলীয় রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বদলে দেওয়া হয়, তাহলে সেই ঐতিহ্যের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয় (Chandan Sen)
চন্দন সেনের মতে, এই প্রবণতা নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে দলীয় প্রভাবের ছাপ দেখা গিয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কংগ্রেস আমলে বিভিন্ন সরকারি ভবনে নেহরুর ছবি বা কংগ্রেসের প্রতীকী উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। বামফ্রন্ট আমলে অনেক জায়গায় লাল রঙের আধিক্য এবং বাম নেতৃত্বের প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছে। যদি বিজেপি ক্ষমতায় এসে একইভাবে সর্বত্র গেরুয়া রং ব্যবহার করে বা রাজনৈতিক নেতাদের ছবি দিয়ে সাংস্কৃতিক পরিসর ভরিয়ে দেয়, তবে সেটিও একইভাবে অগ্রহণযোগ্য হবে। তাঁর মতে, ভুল যদি অতীতে হয়ে থাকে, তবে ভবিষ্যতেও সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হওয়া উচিত নয়।
রং কি শুধুই রং, নাকি রাজনৈতিক বার্তা?
চন্দন সেন প্রশ্ন তুলেছেন—একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের রং কি শুধুই নান্দনিকতার বিষয়, নাকি সেটি রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রতীক হয়ে উঠছে? তাঁর মতে, যখন কোনও ঐতিহাসিক বা সাংস্কৃতিক স্থাপনার নিজস্ব পরিচয় মুছে দিয়ে রাজনৈতিক রঙে রাঙিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেই বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক বলেই প্রতীয়মান হয়। এতে প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষ চরিত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
কলকাতার গর্বকে দলীয় সম্পত্তি বানানো উচিত নয়
কলকাতার ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলি কোনও একটি সরকারের নয়, কোনও একটি রাজনৈতিক দলেরও নয়। এগুলি সমগ্র বাংলার মানুষের সম্পদ। এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ সমানভাবে আসেন, নাটক দেখেন, প্রদর্শনী উপভোগ করেন, সাহিত্যচর্চা করেন। ফলে এগুলিকে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হলে সেই সর্বজনীন চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চন্দন সেনের বক্তব্য, রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রচারের জন্য অসংখ্য মঞ্চ রয়েছে, কিন্তু সংস্কৃতির মঞ্চকে দলীয় প্রতীকে পরিণত করা উচিত নয়।
অতি উৎসাহে দলেরও ক্ষতি হতে পারে (Chandan Sen)
তিনি আরও ইঙ্গিত করেছেন যে, অনেক সময় কিছু ব্যক্তি কোনও রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে নিজেদের উদ্যোগে এমন কিছু কাজ করেন, যা হয়তো দলীয় নীতিরও অংশ নয়। এ ধরনের অতিউৎসাহী পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল বার্তা পৌঁছে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত বিষয়গুলির প্রতি সতর্ক নজর রাখা এবং প্রয়োজনে স্পষ্ট অবস্থান জানানো।
ঐতিহ্য রক্ষায় সর্বদলীয় সংবেদনশীলতা প্রয়োজন
চন্দন সেনের মতে, সরকার বদলাবে, রাজনৈতিক ক্ষমতাও পরিবর্তিত হবে এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু সেই পরিবর্তনের প্রভাব যেন বাংলার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাগুলির ওপর না পড়ে। এই ভবনগুলির নিজস্ব রূপ, নান্দনিকতা এবং ঐতিহাসিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখা সরকারের দায়িত্ব। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তাদের উচিত এই প্রতিষ্ঠানগুলিকে রাজনৈতিক প্রতীকের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা।
আরও পড়ুন: Pabitra Sarkar: “ধর্ষকের কোনো রাজনৈতিক রং হতে পারে?” বারুইপুরের ঘটনায় কড়া বার্তা পবিত্র সরকারের
অবিলম্বে পুনর্বিবেচনার আবেদন
চন্দন সেনের আবেদন, যেসব ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের রং, বহিরঙ্গ বা পরিবেশ রাজনৈতিক ভাবধারার প্রতীক হিসেবে পরিবর্তন করা হয়েছে বা করার চেষ্টা হচ্ছে, তা অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা উচিত। তাঁর বিশ্বাস, কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কোনও রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র বাঙালি সমাজের সম্মিলিত উত্তরাধিকার। সেই উত্তরাধিকারকে অক্ষুণ্ণ রাখা সকলের নৈতিক দায়িত্ব।



