Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল: প্রবল ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল জাপানের দক্ষিণাঞ্চল। রিখটার স্কেলে কম্পনের মাত্রা ছিল ৭.১, যা অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হয়। ভূমিকম্পের পরপরই জাপানের আবহাওয়া দপ্তর সুনামি সতর্কতা জারি করেছে। যদিও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রাণহানি বা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কোনও সরকারি তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও গোটা দেশে উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০১১ সালের ফুকুশিমা পরমাণু বিপর্যয়ের ভয়াবহ স্মৃতি আবারও ফিরে এসেছে সাধারণ মানুষের মনে (Japan Earthquake)।
কোথায় ছিল ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল? (Japan Earthquake)
জাপানের আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিকেলে দক্ষিণ জাপানের কিউশু দ্বীপের কুমামোতো অঞ্চলে এই শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে, প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। এত অল্প গভীরতায় উৎপন্ন ভূমিকম্প সাধারণত বেশি তীব্রভাবে অনুভূত হয় এবং সুনামির সম্ভাবনাও তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সমুদ্রের নিচে হওয়ায় জাপানের আবহাওয়া দপ্তর দ্রুত সুনামি সতর্কতা জারি করে। উপকূলবর্তী এলাকাগুলির বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উপকূল জুড়ে সতর্কতা, শুরু সরিয়ে নেওয়ার কাজ (Japan Earthquake)
ভূমিকম্পের পর সমুদ্র উত্তাল হতে শুরু করেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। সেই কারণে জাপানের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী দ্রুত উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলি খালি করার কাজ শুরু করেছে। বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে, নাগাসাকি, কাগোশিমা, ফুকুওকা, সাগা, ওইতা, মিয়াজাকি, এই সমস্ত অঞ্চলই জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপে অবস্থিত। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের সমুদ্রতীর থেকে দূরে সরে গিয়ে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরমাণু কেন্দ্রগুলিতেও জারি বিশেষ নজরদারি (Japan Earthquake)
জাপানের ইতিহাসে ভূমিকম্প ও সুনামির সঙ্গে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির নিরাপত্তা। তাই এবারও ভূমিকম্পের পর দেশের বিভিন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরমাণু কেন্দ্রগুলিতে কোনও ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যা বা বিকিরণজনিত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে।
২০১১ সালের ফুকুশিমা: যে আতঙ্ক এখনও ভুলতে পারেনি জাপান
এই ভূমিকম্পের পর অনেকেরই মনে ফিরে এসেছে ২০১১ সালের ১১ মার্চের ভয়াবহ দিনটি। সেদিন জাপানের তোহোকু অঞ্চলের উপকূলে ৯.০ মাত্রার এক বিধ্বংসী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এরপর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিশাল সুনামি উপকূলে আছড়ে পড়ে। সেই সুনামির জেরে ফুকুশিমা দাইইচি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি রিঅ্যাক্টরে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ও কুলিং সিস্টেম সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যাওয়ায় রিঅ্যাক্টরগুলিতে গলন (Meltdown) শুরু হয়। বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। চের্নোবিলের পর এটিকেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পরমাণু বিপর্যয় হিসেবে ধরা হয়।
ফুকুশিমার পর বদলে যায় জাপানের জ্বালানি নীতি
ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর জাপান সরকার দেশের সবকটি, অর্থাৎ ৫৪টি পরমাণু চুল্লি ধাপে ধাপে বন্ধ করে দেয়। পরমাণু শক্তির নিরাপত্তা নিয়ে শুরু হয় নতুন করে মূল্যায়ন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তার কারণে কঠোর নিরাপত্তা বিধি মেনে কয়েকটি পরমাণু চুল্লি পুনরায় চালু করা হয়। বর্তমানে প্রতিটি কেন্দ্রেই উন্নত ভূমিকম্প-প্রতিরোধী ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা প্রযুক্তি এবং বহুমাত্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কেন বারবার ভূমিকম্প হয় জাপানে? (Japan Earthquake)
বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলির মধ্যে অন্যতম জাপান। এর প্রধান কারণ দেশটি পৃথিবীর চারটি বৃহৎ টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থিত। এই প্লেটগুলি হল, প্যাসিফিক প্লেট, ফিলিপাইন সি প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট, উত্তর আমেরিকান (ওখোটস্ক) প্লেট, এই প্লেটগুলির মধ্যে ক্রমাগত সংঘর্ষ ও সঞ্চালনের ফলে জাপানে প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বছরে হাজারেরও বেশি কম্পন রেকর্ড করা হয়, যদিও অধিকাংশই কম মাত্রার হওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে তেমনভাবে ধরা পড়ে না।
ভূমিকম্প মোকাবিলায় জাপান (Japan Earthquake)
প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও জাপান বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত দুর্যোগ-প্রস্তুত দেশগুলির একটি। দেশটিতে রয়েছে, অত্যাধুনিক ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, কয়েক সেকেন্ড আগেই সতর্কবার্তা পাঠানোর প্রযুক্তি, ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণ ব্যবস্থা নিয়মিত দুর্যোগ মহড়া, স্কুল, অফিস ও জনপরিসরে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, এই প্রস্তুতির ফলেই বহু বড় ভূমিকম্পেও তুলনামূলকভাবে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
আরও পড়ুন: Cockroach janata party: সোনম অনশন ভাঙলেন, তবুও মোদির কড়া বার্তার পরও প্রতিবাদে অনড় পড়ুয়ারা
বর্তমান পরিস্থিতি
এই মুহূর্তে জাপানের প্রশাসন পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। সুনামির সম্ভাবনা বিবেচনা করে উপকূলবর্তী এলাকাগুলিতে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হয়েছে। পরমাণু কেন্দ্রগুলির নিরাপত্তাও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ভূমিকম্পের পর আফটারশকের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই প্রশাসনের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।



