Last Updated on [modified_date_only] by Aditi Singha
কে টিভি বাংলা ডিজিটাল : একাডেমি অফ ফাইন আর্টসের রঙ বদলকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবার আরও তীব্র রাজনৈতিক মাত্রা পেয়েছে (Rudranil Ghosh)। গেরুয়া রঙ করা, পরে সেই রঙ বদলে দেওয়া এবং ফের গেরুয়া রঙ ফিরে আসা—পরপর এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। এই বিতর্কে সরব হয়েছেন অভিনেতা ও বিজেপি বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, একাডেমির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত শিল্প ও সংস্কৃতির পরিবেশ, কোনও রাজনৈতিক দলের প্রভাব নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই বিষয়ে তিনি বিধায়ক হিসেবে নয়, ‘শিল্পী রুদ্রনীল ঘোষ’ হিসেবে কথা বলছেন।
‘শিল্প-সংস্কৃতি কি বামেদের একার?’—রুদ্রনীলের প্রশ্ন (Rudranil Ghosh)
রুদ্রনীলের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে শিল্প ও সংস্কৃতির উপর রাজনৈতিক মালিকানার প্রশ্ন। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই যেন শিল্প ও সংস্কৃতির স্বাভাবিক প্রতিনিধি। অন্য রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী কেউ শিল্পী হলে তাঁকে আগে রাজনৈতিক পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়। এই দ্বৈত মানসিকতার বিরোধিতা করেছেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, ভারতবর্ষের শিল্প, সংস্কৃতি ও বাংলার বহমান সাংস্কৃতিক পরম্পরা কি কোনও একটি রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি? তাঁর মতে, শিল্পের পরিসরে প্রত্যেকের অংশগ্রহণের অধিকার রয়েছে।
একাডেমি ‘মন্দিরের মতো’, সেখানে রাজনীতির জায়গা নেই
রুদ্রনীল ঘোষ রবীন্দ্রসদন, নন্দন চত্বর এবং একাডেমি অফ ফাইন আর্টসকে শিল্পীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র জায়গা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর কথায়, এই জায়গাগুলি তাঁদের কাছে মন্দিরের মতো। তাই সেখানে রাজনৈতিক পতাকা, রাজনৈতিক দখলদারি কিংবা দলীয় আধিপত্য থাকা উচিত নয়। তাঁর অভিযোগ, একাডেমি চত্বরে সিটুর রাজনৈতিক উপস্থিতি রয়েছে এবং কয়েকটি ঘর দখল করে রাখার বিষয়ও রয়েছে। তাঁর মতে, শিল্পচর্চার জায়গাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা গেলে তবেই তার প্রকৃত মর্যাদা ফিরে আসবে।
গেরুয়া কি শুধুই রাজনৈতিক রঙ? পাল্টা প্রশ্ন (Rudranil Ghosh)
রঙ বিতর্কে রুদ্রনীলের সবচেয়ে জোরালো বক্তব্যগুলির একটি হল গেরুয়া রঙকে শুধুমাত্র বিজেপির সঙ্গে যুক্ত করার বিরোধিতা। তাঁর মতে, গেরুয়া ত্যাগের প্রতীক এবং ভারতীয় সংস্কৃতিতে এই রঙের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে। তিনি দাবি করেন, একাডেমির পুরনো ছবিগুলিতে সামনের অংশে গেরুয়া বা পোড়ামাটির মতো রঙের উপস্থিতি দেখা যায়। তার সঙ্গে গাঢ় চকলেট রঙের বর্ডারও ছিল বলে তাঁর বক্তব্য। তাই গেরুয়া রঙ ব্যবহার করলেই সেটিকে রাজনৈতিক গেরুয়াকরণ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয় বলেই তাঁর মত।
বামপন্থীদের বিরুদ্ধে দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ (Rudranil Ghosh)
রুদ্রনীল অভিযোগ করেন, বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিরা শিল্পী হলে তাঁদের অনেক সময় ‘শিল্পী’ হিসেবেই পরিচয় করানো হয়। কিন্তু অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীর ক্ষেত্রে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়টাই সামনে চলে আসে। নিজের ক্ষেত্রেও একই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, একজন মানুষ একই সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মী এবং শিল্পী হতে পারেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাঁর শিল্পীসত্তাকে অস্বীকার করা উচিত নয়। এই প্রসঙ্গেই তিনি প্রশ্ন তোলেন, শিল্প ও সংস্কৃতির উপর বামপন্থীদের একচেটিয়া অধিকার থাকার ধারণা কোথা থেকে এল?
‘রঙ নয়, একাডেমির আসল সমস্যা পরিকাঠামো’
রঙের বিতর্কের পাশাপাশি একাডেমি অফ ফাইন আর্টসের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়েও বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন রুদ্রনীল। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটির যথাযথ সংস্কার হয়নি। সাউন্ড ও লাইট থেকে দর্শক আসন, এসি থেকে শৌচাগার—বিভিন্ন পরিকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। প্রদর্শনী হল, সেমিনার রুম এবং সামনের চত্বরেরও সংস্কার প্রয়োজন বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, একাডেমির মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে আটকে রেখে তার প্রকৃত সমস্যাগুলিকে আড়াল করা উচিত নয়।
‘অন্ধকার কাটাতে’ সরকারি সাহায্যের প্রয়োজন (Rudranil Ghosh)
একাডেমির পরিকাঠামো উন্নয়নে সরকারের কাছে প্রস্তাব দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন রুদ্রনীল। তিনি বর্তমানে কালচারাল ইনফরমেশন সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে এই বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য, ট্রাস্টি বোর্ড বা ওয়ার্কিং কমিটির ক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন। শিল্প ও শিল্পীদের স্বার্থে একাডেমির সংস্কার এবং আধুনিকীকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে লিখিত প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
‘শিল্পীর পরিচয় মুছে রাজনৈতিক পরিচয় সামনে আনা হচ্ছে’
রুদ্রনীলের বক্তব্যে উঠে এসেছে শিল্পী পরিচয় বনাম রাজনৈতিক পরিচয়ের বিতর্কও। তাঁর অভিযোগ, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাঁকে শিল্পী হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে একাংশের অনীহা রয়েছে। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত শিল্পীদের ক্ষেত্রে উল্টো ছবি দেখা যায়। এই দ্বৈত মানদণ্ডের বিরোধিতা করে তাঁর বক্তব্য, শিল্পীর রাজনৈতিক মতামত থাকতে পারে, কিন্তু সেই কারণে তাঁর শিল্পী পরিচয়কে অস্বীকার করা যায় না। তাঁর মতে, সাংস্কৃতিক জগতকে আরও বহুমাত্রিক ও উন্মুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
রঙের বিতর্কের আড়ালে কি বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাত?
গেরুয়া রঙ নিয়ে বিতর্ক যে শুধুমাত্র রঙের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই, রুদ্রনীলের বক্তব্যে সেটিও স্পষ্ট। তাঁর মতে, একাডেমিতে গেরুয়া রঙ দেখা দেওয়ার পর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে এবং বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমেও রাজনৈতিক ন্যারেটিভের অংশ হয়েছে। তিনি এই ঘটনাকে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর অভিযোগ, একাডেমির মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের লড়াইয়ের পরিবর্তে শিল্প ও সংস্কৃতির উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
আরও পড়ুন : Abhishek Banerjee PA: শালবনি জমি মামলায় ফের সিআইডি-র জেরার মুখে সুমিত রায়
একাডেমি কি রাজনীতিমুক্ত সাংস্কৃতিক পরিসর হবে?
রুদ্রনীল ঘোষের বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক আরও কতদূর গড়ায়, এখন সেটাই দেখার। তবে তাঁর বক্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্ট—একদিকে তিনি গেরুয়া রঙের বিরোধিতাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আক্রমণ করেছেন, অন্যদিকে একাডেমির পরিকাঠামোগত দুরবস্থা দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। তাঁর মূল দাবি, একাডেমি অফ ফাইন আর্টস কোনও রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি শিল্পী, নাট্যকর্মী, চিত্রশিল্পী এবং সংস্কৃতিপ্রেমীদের জায়গা। তাই রাজনৈতিক পতাকা বা দলীয় আধিপত্যের বদলে সেখানে শিল্পচর্চার পরিবেশ তৈরি হওয়াই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। শেষ পর্যন্ত রঙের বিতর্ক ছাপিয়ে একাডেমি যদি সত্যিই একটি মুক্ত, নিরপেক্ষ ও উন্নত সাংস্কৃতিক পরিসরে পরিণত হয়, তবেই এই বিতর্কের ইতিবাচক পরিণতি সম্ভব।



